Saturday, July 27, 2019

৭০ বছরে যাদের হাতে নৌকার হাল

 

উপমহাদেশের প্রাচীন এবং ঐতিহ্যবাহী রাজনৈতিক দল বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ। আজ ২৩ জুন ৭০তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী দলটির। গণতান্ত্রিকভাবে জন্ম নেয়া মুক্তিযুদ্ধে নেতৃত্বদানকারী এই দল উপমহাদেশের রাজনীতিতে গত সাত দশক ধরে অবিচ্ছেদ্য সত্তা হিসেবে নিজেদের অপরিহার্যতা প্রমাণ করেছে। এ দেশের প্রতিটি আন্দোলন-সংগ্রামে দেশের ঐতিহ্যবাহী প্রচীনতম রাজনৈতিক সংগঠন আওয়ামী লীগের ভূমিকা প্রত্যুজ্জ্বল। আওয়ামী লীগ মানেই বাঙালি জাতীয়তাবাদের মূলধারা, সংগ্রামী মানুষের প্রতিচ্ছবি। আওয়ামী লীগ জাতির অর্জন, সমৃদ্ধি আর সম্ভাবনার পথ। অতীতের মতো বাংলাদেশের ভবিষ্যতও আওয়ামী লীগের সঙ্গেই যুক্ত।

৪৭-এর দেশ বিভাগের পর ১৯৪৯ সালে জন্ম হয় আওয়ামী লীগের। ৫২-র ভাষা আন্দোলন, ৬২-র ছাত্র আন্দোলন, ৬৬-র ছয় দফা, ৬৯-এর গণঅভ্যুত্থান, ৭০-এর যুগান্তকারী নির্বাচন সবখানেই সরব উপস্থিতির নাম বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ। ১৯৭১ সালের মহান স্বাধীনতা অর্জন হয় আওয়ামী লীগের হাত ধরেই। কিন্তু জন্মের পর থেকে বঞ্চিতের অধিকার প্রতিষ্ঠায় বাধাভাঙা গতিতে এগিয়ে চলার মাঝে হঠাৎ ছন্দপতন ঘটে নৌকার গতিতে। দুই দশক ধরে পরাজিত কুচক্রীর দল ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট সপরিবারে হত্যা করে নৌকার অদম্য মাঝি ও বাঙালি জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে। ১৯৪৯ সালে জন্ম থেকে ২০১৯ সাল পর্যন্ত বঙ্গবন্ধুর ঐতিহাসিক সেই আদর্শের নৌকার প্রধান দুটি পদ সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদক হিসেবে শক্ত হাতে হাল ধরেছেন দলের নিবেদিতরা।

১৯৪৯ সালে দেশের প্রাচীন ও ঐতিহ্যবাহী দল আওয়ামী লীগের যাত্রা শুরু। একই বছরের ২৩ জুন পুরান ঢাকার কেএম দাস লেনের ঐতিহাসিক রোজ গার্ডেনে ততকালীন পাকিস্তানের প্রথম ও প্রধান বিরোধী দল হিসেবে পূর্ব পাকিস্তান আওয়ামী মুসলিম লীগ প্রতিষ্ঠা লাভ করে। প্রথম কাউন্সিলে মওলানা আবদুল হামিদ খান ভাসানী এবং শামসুল হককে দলের সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদক নির্বাচিত করা হয়। তখন তরুণ নেতা শেখ মুজিবুর রহমান ছিলেন কারাগারে বন্দি। বন্দি অবস্থায় তাকে সর্বসম্মতিক্রমে প্রথম কমিটির যুগ্ম সম্পাদক নির্বাচিত করা হয়। ১৯৫৩ সালে ময়মনসিংহে দলের দ্বিতীয় কাউন্সিল অনুষ্ঠিত হয়। এতে মওলানা আবদুল হামিদ খান ভাসানী সভাপতি এবং শেখ মুজিবুর রহমান সাধারণ সম্পাদক হন।

১৯৫৫ সালের ২১-২৩ অক্টোবর ঢাকার সদরঘাটের রূপমহল সিনেমা হলে দলের তৃতীয় কাউন্সিল অধিবেশনে আওয়ামী লীগ অসাম্প্রদায়িক সংগঠনে পরিণত হয়। ‘মুসলিম’ শব্দটি বাদ দিয়ে দলের নতুন নামকরণ হয় পূর্ব পাকিস্তান আওয়ামী লীগ। পরে কাউন্সিল অধিবেশনে সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদক পদে মওলানা ভাসানী ও বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব বহাল থাকেন। ৫৭ সালে কাগমারী সম্মেলনে দলের আন্তর্জাতিক নীতির প্রশ্নে সোহরাওয়ার্দী-ভাসানীর মতপার্থক্যের কারণে প্রথমবারের মতো আওয়ামী লীগ ভেঙে যায়। ভাসানীর নেতৃত্বে গঠিত হয় ন্যাশনাল আওয়ামী পার্টি (ন্যাপ)। আর মূল দল আওয়ামী লীগের সভাপতি নির্বাচিত হন মওলানা আবদুর রশীদ তর্কবাগীশ ও সাধারণ সম্পাদক শেখ মুজিবুর রহমান বহাল থাকেন। ১৯৫৮ সালে পাকিস্তানে সামরিক শাসন জারি হলে আওয়ামী লীগের কর্মকাণ্ড স্থগিত করা হয়। ১৯৬৪ সালে দলটি পুনরুজ্জীবিত করা হয়। এতে সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদক পদে তর্কবাগীশ ও শেখ মুজিবুর রহমান অপরিবর্তিত থাকেন।

১৯৬৬ সালের কাউন্সিলে দলের সভাপতি পদে নির্বাচিত হন শেখ মুজিবুর রহমান। তার সঙ্গে সাধারণ সম্পাদক নির্বাচিত হন তাজউদ্দীন আহমদ। এর পরে ১৯৬৮ ও ১৯৭০ সালের কাউন্সিলে সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদক অপরিবর্তিত থাকেন। এই কমিটির মাধ্যমেই পরিচালিত হয় মহান মুক্তিযুদ্ধ। দেশ স্বাধীন হওয়ার পর ১৯৭২ সালে ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের প্রথম কাউন্সিলে সভাপতি হন জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান এবং সাধারণ সম্পাদক নির্বাচিত হন প্রয়াত রাষ্ট্রপতি মো. জিল্লুর রহমান।

১৯৭৪ সালে বঙ্গবন্ধু স্বেচ্ছায় সভাপতির পদ ছেড়ে দিলে সভাপতির দায়িত্ব দেয়া হয় পঁচাত্তরে কারাগারে ঘাতকদের হাতে নিহত জাতীয় নেতাদের অন্যতম এ এইচ এম কামারুজ্জামানকে। সাধারণ সম্পাদক পদে বহাল থাকেন মো. জিল্লুর রহমান। ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট আসে আওয়ামী লীগের ওপর মরণাঘাত। জাতির পিতা বঙ্গবন্ধুকে সপরিবারে হত্যার পর রাজনৈতিক পটপরিবর্তন হলে আওয়ামী লীগের রাজনীতি আবারো স্থগিত করা হয়। ১৯৭৬ সালে ঘরোয়া রাজনীতি চালু হলে আওয়ামী লীগকেও পুনরুজ্জীবিত করা হয়। এতে সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদক করা হয় যথাক্রমে মহিউদ্দিন আহমেদ ও বর্তমান সংসদের উপনেতা সৈয়দা সাজেদা চৌধুরীকে। ১৯৭৭ সালে এই কমিটি ভেঙে করা হয় আহবায়ক কমিটি। এতে দলের আহবায়ক করা হয় সৈয়দা জোহরা তাজউদ্দীনকে। ১৯৭৮ সালের কাউন্সিলে দলের সভাপতি করা হয় আবদুল মালেক উকিলকে এবং সাধারণ সম্পাদক হন আব্দুর রাজ্জাক।

এরপরই শুরু হয় আওয়ামী লীগের উত্থানপর্ব, উপমহাদেশের বৃহত্তম রাজনৈতিক দল হিসেবে গড়ে তোলার মূল প্রক্রিয়া। সঠিক নেতৃত্বের অভাবে দলের মধ্যে সমস্যা দেখা দিলে নির্বাসনে থাকা বঙ্গবন্ধুকন্যা বর্তমান প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে দেশে ফিরিয়ে আনা হয় নৌকা ও দেশের হাল ধরতে। দেশে ফেরার আগেই ১৯৮১ সালের কাউন্সিলে শেখ হাসিনাকে আওয়ামী লীগের সভাপতি নির্বাচিত করা হয়। এরপর কাউন্সিল অধিবেশন ১৯৮৭ সালে সভাপতি শেখ হাসিনা, সাধারণ সম্পাদক হন বেগম সাজেদা চৌধুরী। ১৯৯২ আবারো সভাপতি শেখ হাসিনা নির্বাচিত হন। আর সাধারণ সম্পাদক হন জিল্লুর রহমান।

১৯৯৭ কাউন্সিল অধিবেশনে মাধ্যমে সভাপতি শেখ হাসিনা, সাধারণ সম্পাদক জিল্লুর রহমান নির্বাচিত হন। এরপর ২০০২ সভাপতি শেখ হাসিনা, সাধারণ সম্পাদক হন মো. আব্দুল জলিল। ২০০৯ ও ২০১২ সালে পুনরায় সভাপতি শেখ হাসিনা ও সাধারণ সম্পাদক হন সৈয়দ আশরাফুল ইসলাম। সর্বশেষ ২০১৬ থেকে বর্তমান সভাপতি শেখ হাসিনা ও সাধারণ সম্পাদক নির্বাচিত হন ওবায়দুল কাদের। যাদের নেতৃত্বে আওয়ামী লীগ জনগণের দলে পরিনত হয়েছে।

No comments:

Post a Comment