Wednesday, October 9, 2019

হত্যা রাজনীতি বনাম ছাত্র রাজনীতি। আইসিটিনিউজ বিডি২৪

আইসিটিনিউজ বিডি২৪: আরিফুল্লাহ নূরী,বিশেষ প্রতিনিধি: স্বাধীন মুক্তচিন্তা চর্চার জায়গা বিশ্ববিদ্যালয়গুলো ক্রমেই হয়ে পড়ছে সন্ত্রাসের অভয়ারণ্য। ক্যাম্পাসে আধিপত্য বিস্তার এবং অভ্যন্তরীণ কোন্দলের ফলাফল হিসেবে অস্ত্রবাজী এবং হত্যার সংস্কৃতিতে সাম্প্রতিক সময়ে প্রাণ বিসর্জন মেধাবি শিক্ষার্থীদের। টেন্ডারবাজি, চাঁদাবাজির ফলাফল এই নিহত শিক্ষার্থীদের হত্যার কোন বিচার হয়নি, হয়নি প্রশাসনিক এবং রাজনৈতিকভাবে এই অপসংস্কৃতি রোধে কোন বড় ধরণের চেষ্টা। রাষ্ট্রের শীর্ষ চার পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় ও চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে সন্ত্রাস, হত্যা, রক্তের স্রোত প্রায় নিত্য নৈমিত্তিক ঘটনা।

১৯৭২ -২০১২ এই সময়ে এই চার বিশ্ববিদ্যালয়ে নোংরা ছাত্ররাজনীতির বলি ১২৯ টি মেধাবী মুখ ! প্রতিটি হত্যার পরেই তদন্ত কমিটি নামক তামাশা সাজানো হয়েছে, যাদের রিপোর্ট রাজনৈতিক পুতুল নাচের খেলার ফলে কখনোই আলোর মুখ দেখেনি। প্রধান রাজনৈতিক দলগুলো বহুবার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে ক্যাম্পাসকে সন্ত্রাসমুক্ত রাখার। কিন্তু ’ওয়াদা ভাঙার জন্যই ওয়াদা করা হয়’ নীতিতে বরাবরই তারা মঞ্চস্থ করেছে ধর্ষণ ও হত্যার নাটক।
১৯৯৭ সালে ছাত্রলীগ নেতা আনন্দ কুমারকে পয়েন্ট ব্লাক রেঞ্জ থেকে গুলি করে হত্যা করা হয়। শওকত কবীর দিপুও হয়েছিলেন রাজনৈতিক দ্বন্দ্বের বলি। ১৯৭৩ সালে জাকসু’র জিএস রোকনকে গুলি করে হত্যা করা হয়। এই কোন হত্যাকান্ডেরই বিচার হয়নি।
মেধা এবং সুস্থ রাজনীতির চর্চা বিশ্ববিদ্যালয়গুলো থেকে প্রায় হারিয়ে গেছে। কিন্তু এখনও সুস্থ ধারার ছাত্ররাজনীতি করে যাচ্ছে এমন সংগঠন বিরল নয়। এছাড়া সাধারণ ছাত্ররাও সন্ত্রাস এবং মাদকের ছড়াছড়ির বিরুদ্ধে ঐক্যবদ্ধ হতে পারছে না। সন্ত্রাসমুক্ত শিক্ষাঙ্গন গড়ার প্রতিশ্রুতি আমরা উপরমহল থেকে বহুবার শুনেছি, কিন্তু সন্ত্রাসের ইন্ধন বন্ধ হয়নি। শিক্ষাঙ্গনকে সন্ত্রাসমুক্ত করতে হলে দল থেকে সন্ত্রাসীদের বিতাড়ন করতে হবে। আমরা আর কোন ছাত্র বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়তে এসে লাশ হয়ে ফিরে যাওয়া দেখতে চাই না। শিক্ষাঙ্গনে সন্ত্রাস যখন শেকড় গেঁড়ে বসেছে, তখন দেশ আবার ফিরে তাকাচ্ছে ছাত্রদের দিকে। এই ছাত্ররাই ভাষার জন্য আন্দোলন করেছে, দেশের জন্য যুদ্ধ করেছে, স্বৈরাচার প্রতিহত করেছে। এই ছাত্ররাই পারবে স্বাধীন বাংলায় অধিকার আদায়ের মাধ্যমে সোনার বাংলা গঠন করতে।
বাংলাদেশে ছাত্র হত্যার বিচার একটি প্রহসন হয়েই আছে এখনো। এই নোংরা সংস্কৃতি একদিনেই তৈরি হয়নি আর সমাধানের পথটাও খুব সোজা নয়। ছাত্রসংগঠনগুলো কোন রাজনৈতিক দলের সাথেই সরাসরি জড়িত নয়। তারা মূলত ব্যবহৃত হয় মূল দলের টেন্ডারবাজি, অস্ত্রবাজি, আধিপত্য বিস্তার, দখলদারিত্বসহ বিভিন্ন স্বার্থসিদ্ধির কাজে। মেধাবীদের কাছে পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলো ক্রমেই ভয় আর বিভীষিকার এক নাম হয়ে উঠছে। যার দরুণ ছাত্ররা বিদেশে উচ্চশিক্ষায় অধিক আগ্রহী হচ্ছে এবং প্রতিবছর মেধাবীদের বিরাট একটা অংশ দেশের বাইরে চলে যাচ্ছে। রাষ্ট্র হারাচ্ছে মেধাবী এবং দক্ষ জনসম্পদ।
রাজনৈতিক দলগুলো নিজেদের ক্ষমতায় যাবার সিঁড়ি হিসেবে ব্যবহার করছে ছাত্রদের। চাঁদাবাজি, টেন্ডারবাজি, অস্ত্রবাজি এগুলো সবই ইন্ধন দিয়ে টিকিয়ে রেখেছে রাজনীতিবিদেরা। ফলশ্রুতিতে নেতৃত্বশূন্য হচ্ছে ছাত্ররা, রাষ্ট্রও পাচ্ছে না নতুন নেতৃত্ব। পলিটিকাল ভিউ হিসেবে আই হেইট পলিটিক্স বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রদের সবচেয়ে পরিচিত আইডেন্টিটি। অথচ ইতিহাস সাক্ষী এই ভূখন্ডের সবগুলো ইতিবাচক পরিবর্তনে চালকের ভূমিকায় ছিলো ছাত্ররাজনীতি। প্রশাসনের দলীয়করণ প্রত্যেক সরকারেরই অন্যতম নৈমত্তিক কাজ, আর তাদের ইন্ধনেই সন্ত্রাস করে ছাত্রসংগঠনগুলো। লেজুড়বৃত্তির রাজনীতি আমাদের শিক্ষাঙ্গনকে কলুষিত করে ফেলছে। শিক্ষার্থীদের অধিকারের আন্দোলনে ছাত্র সংগঠনগুলোকে পাওয়া যায় না। ছাত্রলীগ কিংবা ছাত্রদল অথবা শিবির, এই সব সংগঠনই দলের প্রতি দায়বদ্ধ, শিক্ষার্থীদের প্রতি প্রতিশ্রুতিবদ্ধ নয়। তারা মূল সংগঠনের লেজুড়ে পরিণত। মূল সংগঠনের নেতারা তাদের প্রভাব-বলয় ঠিক রাখার জন্য ছাত্রনেতাদের পৃষ্ঠপোষকতা দেন।
মূলত : ছাত্ররাজনীতি ঐতিহ্যবিচ্যুত হয়েছে এবং হচ্ছে। এখানে বিভিন্ন শক্তি কাজ করে থাকে। এ থেকে পরিত্রাণের জন্য রাজনীতি, সমাজ, শিক্ষাসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রের নেতৃস্থানীয় ব্যক্তিদের এগিয়ে আসতে হবে। ছাত্র সংসদগুলোর নিয়মিত নির্বাচন হতে হবে। ছাত্ররাজনীতি থাকতে হবে; তবে সেটা প্রথাগতভাবেই থাকতে হবে, তা নয়। সঠিক নেতৃত্বকে কিভাবে সামনে আনা যায় তা নিয়েও ভাবতে হবে। এই হত্যা রাজনীতি থেকে বেরিয়ে আসতে হলে রাজনীতির চেয়ে আদর্শকে অধিক গুরুত্ব সহকারে নিতে হবে। সঠিক আদর্শ বুকে ধারণ করে সত্য ও ন্যায়ের পক্ষে জীবনকে পরিচালিত করার মধ্য দিয়ে গঠিত হবে সুন্দর সমাজ ও দেশপ্রেম। রচিত হবে ছাত্ররাজনীতির আদর্শ মূল্যায়ন।
লেখক:
আরিফুল্লাহ নূরী
সম্পাদক, সিবিএম নিউজ

 

No comments:

Post a Comment